Sunday, April 26, 2026

আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচারে যা করা যেতে পারে


ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে শেখ হাসিনা পতন ঘটে ৫ আগস্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই হত্যাকাণ্ড, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন-নিপীড়ন ও গুমসহ সব অপরাধের বিচারের দাবি উঠেছে। একদিকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মাধ্যমে বিচার করার প্রস্তাব এসেছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গত ১৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-বাংলাদেশে (আইসিটিবিডি) বিচারের কথা বলেছেন।

বলাবাহূল্য আওয়ামী শাসনামলে সংঘটিত অপরাধগুলো আইসিসি ও আইসিটিবিডি উভয় আদালতেই করা সম্ভব। কিন্তু উক্ত আদালত দুটির বিচারপ্রক্রিয়ায় বেশ কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারকে একটা অ্যাড হক আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা উচিত।

আইসিসি ১ জুলাই ২০০২ সালে রোম সংবিধি (১৯৯৮) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণত এই আদালত জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসন নামক চারটি আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার করার জন্য এখতিয়ারপ্রাপ্ত। যেহেতু বাংলাদেশ ১ জুন ২০১০ সাল থেকে আইসিসির সদস্য, এই আদালত আওয়ামী আমলে সংঘটিত সকল আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ী সকল ব্যক্তিকে বিচার করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারকে চারটি আইনি ও নীতিগত কারণে আওয়ামী আমলে সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য আইসিসির সমীপে উত্থাপন করা যুক্তিসংগত নয়।

প্রথমত, আইসিসি বর্তমানে বিশেষ করে ইউক্রেন ও প্যালেস্টাইন পরিস্থিতিকে আমলে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে, ভীষণ কাজের চাপে জর্জরিত। এছাড়াও, আইসিসি তার দীর্ঘ ও জটিল বিচার প্রক্রিয়ার জন্য সমালোচিত। এই প্রেক্ষাপটে আইসিসি বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিকে দ্রুত তদন্ত করবে, সেটি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

দ্বিতীয়ত, আইসিসি শুধুমাত্র কিছু গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ব্যক্তিকে বিচার করে থাকে। বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধের প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যক্তি ও কিছু অপরাধের ঘটনা আইসিসির এখতিয়ারে পড়লেও অনেক ব্যক্তি ও অনেক অপরাধ বিচারের আওতার বাইরে থেকে যাবে।

তৃতীয়ত, রোম সংবিধি অনুযায়ী কোনও ব্যক্তিকে তার অনুপস্থিতিতে বিচার করা যায় না। এজন্য আইসিসি অনেক ব্যক্তির বিচারকার্য আদ্যবধি শুরু করতে পারেনি। যেহেতু ভারতসহ পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র আইসিসির সদস্য নয়, সেহেতু আইসিসি উক্ত অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার বা বহিঃসমর্পণ করে বিচার শুরু করতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে।

সর্বশেষ, রোম সংবিধি অনুসারে শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্র কোনও আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করতে অক্ষম বা অনাগ্রহী হলেই আইসিসি তার বিচার করতে পারে। এটিকে কমপ্লিমেন্টারিটি (complementarity) নীতি বলে। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা শাসনামলে সংঘটিত অপরাধসমূহকে বিচার করতে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশে উক্ত অপরাধসমূহকে বিচার করার জন্য একটি চলমান বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল আছে, সেক্ষেত্রে আইসিসি বাংলাদেশে উক্ত অপরাধসমূহকে বিচার করতে অপরাগতা (inadmissible) প্রকাশ করতে পারে।

উল্লেখিত কারণে আইসিসি বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য যথাযথ আদালত নয়। এক্ষেত্রে কমপ্লিমেন্টারিটি নীতি অনুসারে দেশীয় আদালতেই উক্ত অপরাধসমূহের বিচার করা শ্রেয়। উল্লেখ্য যে মাননীয় আইন উপদেষ্টার ঘোষণার প্রেক্ষাপটে অদ্যবধি শেখ হাসিনাসহ বেশ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইসিটিবিডি সমীপে দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে উক্ত অপরাধসমূহকে আইসিটিবিডিতে বিচার করতে গেলে সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে পারে।

প্রথমত, আইসিটিবিডি আইন (১৯৭৩) মূলত নুরেমবার্গ চার্টার (১৯৪৫) অনুকরণে করা হয়েছে এবং এতে আগে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হলেও তা রোম সংবিধিকে প্রতিফলন করে না।

যেমন, রোম সংবিধিতে গুম নামক অপরাধ থাকলেও এই আইনে তা নেই।

দ্বিতীয়ত, আইসিটিবিডি অতীতে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আইনগত ও রাজনৈতিক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল। এই ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধি সম্পর্কে জাতিসংঘসহ অনেক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তুলেছিল।

তৃতীয়ত, এই ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া অনেক সময় সাপেক্ষ ও সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত, এই ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে করতে হয়।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অদ্যবধি ৫৫টি রায় দিলেও মাত্র ৬টি মামলার আপিল ও ৫টি মামলার রিভিউ নিষ্পত্তি করেছে।

চতুর্থত, আইসিটিবিডিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে উল্লিখিত ৬টি আপিল ও ৫টি রিভিউ মামলার অভিযুক্তদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টটা ছিল।

এক্ষেত্রে, অনেক অপরাধের শিকার ব্যক্তি (ভিকটিম) এই ট্রাইব্যুনালের উপর ভরসা নাও রাখতে পারে।

পঞ্চমত, আইসিটিবিডি আইনে রোম সংবিধির অনুকরণে ভিকটিমের কোনও অংশগ্রহণের বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে আইসিটিবিডির গ্রহণযোগ্যতা নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সর্বশেষ, আইসিটিবিডি আইন বাংলাদেশের দেশীয় আইন হওয়ায় এই আইনের অধীনে চলমান বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সরকারি নীতির পরিবর্তনের কারলে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এটি আওয়ামী লীগ আমলে সম্পূর্ণ বিচারসমূহের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলেই অনুমান করা যায়।

উল্লেখিত কারণে আইসিটিবিডিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে গেলে তা স্ববিরোধী এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা ভিকটিমদের সাথে প্রতারণার শামিল হয়ে যাবে।

আইসিসি ও আইসিটিবিডিতে শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে গিয়ে উল্লেখিত সম্ভাব্য সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের সাথে সমন্বয় করে একটি অ্যাড হক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করার কথা বিবেচনায় আনতে পারে। এ জাতীয় ট্রাইব্যুনালে দেশি ও আন্তর্জাতিক উপাদানের (যেমন- বিচারক, তদন্তকারী ও অন্যান্য কর্মচারী) উপস্থিত থাকায় হাইব্রিড ট্রাইব্যুনালও বলা হয়ে থাকে।

অতীতে কম্বোডিয়া জাতিসংঘের সহযোগে খেমার আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য এ জাতীয় ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমানে, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে আরেকটি হাইব্রিড ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য যে, আইসিসি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের ওপর একটি তদন্ত পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত ট্রাইব্যুনালের কাঠামো, এখতিয়ার ও কার্যবিধি সরকার ও ভিকটিমদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করার একাধিক সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এই আদালত সাধারণত একটি আন্তর্জাতিক ট্রিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উক্ত ট্রিটিতে ভিকটিম, সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন কাঠামোগত ও কার্যবিধিগত দিক সংযোজন করা যাবে।

দ্বিতীয়ত, এ জাতীয় ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে, উক্ত ট্রাইব্যুনাল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে বিচারকার্য সম্পাদন করতে পারে।

তৃতীয়ত, এই ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক বিচারক, তদন্তকারী ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অভিযুক্তদের মানবাধিকার ও ভিকটিমদের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করবে।

ফলে এই বিচারের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে এই ট্রাইব্যুনালের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

চতুর্থত, এ জাতীয় ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তকে বিনা উপস্থিতিতে বিচার করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর লেবাননে বিনা উপস্থিতিতে বিচার এখতিয়ার রয়েছে।

এছাড়া এই ট্রাইব্যুনাল জাতিসংঘের সহযোগে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন অভিযুক্তকে বিভিন্ন দেশ থেকে বহিঃসমর্পন করার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

পঞ্চমত, এ জাতীয় ট্রাইব্যুনালে ভিকটিমদের কার্যপ্রণালীতে অংশগ্রহণ করার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকারাদি নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, এক্সট্রাঅরডিনারি চেম্বার ইন দ্য কোর্টস অব কম্বোডিয়াতে ভিকটিমদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

সর্বশেষ, এ জাতীয় ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক ট্রিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে এর মেয়াদকাল সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। বরং, এটির কার্যপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রক্ষাপটের পরিবর্তনের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হয় না।

বাংলাদেশ সরকারের শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা আছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যকে সামনে না রেখে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিশন পূরণকল্পে আইসিসি বা আইসিটিবিডির সমীপে দ্বারস্থ না হয়ে একটি হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে সফলতার সাথে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা রাখা যায়।

লেখক: প্রভাষক, আন্তর্জাতিক আইন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে




👇Observe extra 👇
👉 bdphone.com
👉 ultraactivation.com
👉 trainingreferral.com
👉 shaplafood.com
👉 bangladeshi.assist
👉 www.forexdhaka.com
👉 uncommunication.com
👉 ultra-sim.com
👉 forexdhaka.com
👉 ultrafxfund.com
👉 ultractivation.com
👉 bdphoneonline.com

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Latest Articles