বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে ক্যাম্পাস। আন্দোলন চললেও পদত্যাগ করেননি তারা। এতে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অফিসে না আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্মে অচলাবস্থা ও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার নিয়োগ লাভের পরই জড়িয়ে পড়েন নানান অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। বিভিন্ন পদে দলীয় অনুগত লোকদেরকে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। মোটা অঙ্কের টাকা ও দলীয় পরিচয় হয়ে ওঠে তার নিয়োগের অন্যতম শর্ত। তবে টাকা লেনদেনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ ব্যতীত কিছু লোকও ভিসির সুনজরে আসে এবং তাদেরকে ভালো পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তার কর্মকাণ্ডের কারণে তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই তখন মুখ খোলেননি। গত ৬ আগস্ট থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক আটকে দিয়ে তারা ক্যাম্পাসে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন ও মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছেন।
বাউবির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত ও বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে দলীয় প্রভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ূন আখতারকে ২০২১ সালের ৩০ জুন বাউবির উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। কোনও নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে তার অনিয়ম দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এসব বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাদের নানাভাবে হয়রানি করে দমন করেন। সম্প্রতি সরকারের পতনের পর এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য এখন সরব হয়ে উঠেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ব্যানারে ছাত্ররা ৭ দফা দাবি নিয়ে প্রথমে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টর পদ সৃষ্টি করা, ভর্তি ও তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী হয়রানি বন্ধ করা, আইডি, সনদ ও মার্কশিটের সংশোধনীর ক্ষেত্রে অভিযোগের নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কিত অভিযোগ চ্যালেঞ্জ দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি ও সংশোধিত ফলাফল প্রকাশের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুকরা, একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রবর্তন ও তার যথাযথ অনুসরণে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা ও প্রোগ্রাম রিলেটেড বই সংগ্রহ করা এবং অফিসিয়াল কাজে বরাদ্দ করা ভবনগুলো দ্রুততম সময়ে খালি করে শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করা ও একাডেমিক ভবন নির্মাণ ও আধুনিক ল্যাব নির্মাণের প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা। শিক্ষার্থীরা অনেক আগে থেকেই এসব দাবি জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
বাউবির উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। একইসঙ্গে উপাচার্যের সব অপকর্মের সহযোগী হিসেবে প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারারেরও পদত্যাগ দাবি করেছেন তারা। পদত্যাগ দাবিতে গত ৬ আগস্ট থেকে বাউবির মূল ক্যাম্পাসে চলছে লাগাতার আন্দোলন। আন্দোলনের কারণে ভিসি, প্রো-ভিসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অফিসে না আসায় সব ধরনের কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে ভিসিসহ তার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পদত্যাগ না করলে যেকোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্দোলনকারীরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিসির বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ জানালে কোনও সুরাহা হয়নি। বিভিন্ন দফতরে লিখিত দাবি পেশ করলেও কোনও দাবি মেনে নেননি কর্তৃপক্ষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর তাদের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের যৌক্তিক দাবি না মেনে ভিসিসহ কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদেরকে নানা হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রতিনিধি মিরাজ অভিযোগ করেন, আমাদের ৭ দফা দাবি এখন এক দফা দাবিতে পরিণত হয়েছে। সেটা হচ্ছে স্বৈরাচারী সরকারের দোসর ভিসি, প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার, ডিন ও আঞ্চলিক প্রধানদের পদত্যাগ। এই সম্পূর্ণ প্রশাসন হাসিনা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত। এদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখা।
তার দাবি, ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিগত সংসদ নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকা আওয়ামী সরকারের তহবিলে দিয়েছে। আমাদের আন্দোলনের সময় ভিসি ও তার দোসররা আমাদেরকে রাজাকার বলে আখ্যায়িত করে, আমরা আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছি বলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে। এই ভিসি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হাসিনার সঙ্গে মিটিং করে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ভার্সিটির আইন বিভাগের অনার্স সার্টিফিকেট মাত্র ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ক্ষুণ্ন করে। টাকার বিনিময়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ প্রদান করেছে। আমরা এ জন্য তাদের পদত্যাগ দাবি করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা আমাদের দাবি নিয়ে ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করলে, তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করেননি। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার আমরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করি এবং ভিসির রুমের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করি। এ সময় ভিসির অনুগতরা আমাদেরকে হয়রানি করে এবং নানা ধরনের হুমকি প্রদান করে। আমরা অবিলম্বে ভিসি, প্রোভিসিসহ তার অনুগত সবার পদত্যাগ দাবি করছি। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য ওনারাই দায়ী থাকবেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম শুভ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি তার অনুগত লোকদের দিয়ে টাকার বিনিময়ে এলএলবি সার্টিফিকেট বিক্রি করতেন। আমাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় ইস্যু করা সব এলএলবি সনদ ভেরিফিকেশন করতে হবে। ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে ভর্তি আবেদন থেকে শুরু করে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের শিটের স্বাক্ষরসহ সব বিষয় যাচাই-বাছাই করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, সরকার পতনের পর আমরা শিক্ষকরা ৬ আগস্ট ভিসির সঙ্গে দেখা করে তাকে অবিলম্বে সসম্মানে পদত্যাগ করার অনুরোধ করি। কিন্তু ভিসি স্বপদে বহাল থেকে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি ছাত্রদের ও শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি দাওয়াকে পাশ কাটিয়ে তার অনিয়ম ও দুর্নীতি আড়াল করতে রাতের বেলা বিপুল পরিমাণ ফাইল সরিয়ে নিয়েছেন। গত শুক্রবারও তার অনুগত লোকদের দ্বারা বিভিন্ন ফাইল ও কাগজপত্র সরিয়ে নেন।
তিনি দাবি করেন, ভিসি অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও জাতীয়তাবাদী নামধারী কিছু সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা ভিসির পক্ষ নিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে নানাভাবে হয়রানি করছে। শিক্ষকদের সঙ্গে ট্রেজারার অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। আমরা রবিবারের মধ্যে ভিসি ও তার অনুগতরা পদত্যাগ না করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেবো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আঞ্চলিক প্রধান জানান, ভিসি স্বপদে বহাল থাকার জন্য নানা কূট কৌশল অবলম্বন করছেন। তিনি ভিসি পদে বহাল থাকতে টোপ হিসেবে কিছু সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাউবির এফডিআর ভেঙ্গে ১৪১ কোটি টাকা হাউজ লোন দেবেন বলে লোভ দেখিয়েছেন। ফলে লোভে পড়ে কিছু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভিসির পক্ষে দালালি করছেন। গত ৭ আগস্ট থেকে বাউবি কর্তৃপক্ষ গাজীপুর ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অচল ও অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। তারপরও ভিসি আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন পদে অনলাইনে ভাইভার মাধ্যমে শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা করছেন। নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিসি অনেক প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। বর্তমানে তা জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। ভিসি যেন কোনও নিয়োগ না দিতে পারে, সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মহলের সহযোগিতা কামনা করছি।
এসব বিষয় জানতে প্রো-ভিসি মাহবুবা নাসরিনকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে ভিসি ড. সৈয়দ হুমায়ূন আখতারের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
ট্রেজারার প্রফেসর মোস্তফা আজাদ কামাল জানান, ভিসিসহ কয়েকজনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে ভিসি প্রোভিসিসহ অন্যরা দুই দিন অফিস করেছিলেন। আমি নিয়মিত অফিসে এসে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। তবে তিনি স্বীকার করেন, ভিসি প্রো-ভিসিরা অফিসে না আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কাজ কর্মে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
👇Observe extra 👇
👉 bdphone.com
👉 ultraactivation.com
👉 trainingreferral.com
👉 shaplafood.com
👉 bangladeshi.assist
👉 www.forexdhaka.com
👉 uncommunication.com
👉 ultra-sim.com
👉 forexdhaka.com
👉 ultrafxfund.com
👉 ultractivation.com
👉 bdphoneonline.com
